লাখো মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় চির নিদ্রায় দক্ষিণবঙ্গের প্রিয় নেতা তরিকুল ইসলাম

লাখো মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চির নিদ্রায় শায়িত হলেন দক্ষিণবঙ্গের মানুষের প্রিয়নেতা তরিকুল ইসলাম। এর আগে যশোরের ঈদগাহ ময়দানে তার নামাজে জানাজায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। যশোরের ইতিহাসে এতো বেশি মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা এর আগে কখনো হয়নি।
পূর্ব নির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল সোমবার বিকেল চারটায় বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে আনা হয়। এখানে যশোরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সর্বস্তরের মানুষ প্রিয়নেতা তরিকুল ইসলামকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। এ সময় ফুলে ফুলে ঢেকে যায় তার কফিন। পড়ে যায় হাজারো মানুষের দীর্ঘ লাইন। এক পর্যায়ে শহরের সবচেয়ে বড় খোলা জায়গাটি কয়েক মিনিটের মধ্যে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। ঈদগাহ ময়দান ছাড়িয়ে মানুষ পূর্বে মুজিব সড়ক, দক্ষিণে জেলা জজ আদালত চত্বর, উত্তরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে কাতারবন্দী হন। এমন কি জায়গা না পেয়ে কিছু লোককে মরদেহের সামনের দিকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখা যায়। ফলে বার বার ঘোষণা দিয়েও জানাজার নামাজ শুরু করা যাচ্ছিল না। উপস্থিত লোকজনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বিএনপি নেতৃবৃন্দ। মুজিব সড়কে মানুষের স্রোত এক কিলোমিটার থাকায় এক পর্যায়ে মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়, একই স্থানে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আপনারা যারা প্রথম জানাজায় অংশ নিতে পারছেন না, তারা দ্বিতীয় জানাজায় অংশ নেবেন। কিছু সময়ের মধ্যেই অবশ্য ধর্মীয় কারণে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। জানানো হয়, একই স্থানে দ্বিতীয় দফা জানাজা হওয়ার সুযোগ নেই। এ ঘোষণার ফলে যে যেখানে ছিলেন সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়েন }} ২ পাতার ৩ কলাম
জানাজার নামাজ পড়তে। এমন কি কিছু লোককে মরদেহের পশ্চিমপাশে বাদশাহ ফয়সাল স্কুল, সরকারি বালিকা বিদ্যালয় স্কুলের পাশের দুই রাস্তায়ও দাঁড়িয়ে যেতে দেখা যায়।
প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন বলেন, এটি যশোরের ইতিহাসে সর্ববৃহত্তম জানাজার নামাজ। এতো বেশি মানুষ আর কোনো জানাজায় অংশ নেননি। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আমিরুল ইসলাম রন্টু বলেন, আমার জীবদ্দশায় যশোরে এতো বেশি মানুষকে কোনো জানাজায় অংশ নিতে দেখিনি। দলমত নির্বিশেষে মানুষ এসেছেন তরিকুল ইসলামের জানাজায়।
এদিকে, শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদনকালে বক্তব্য রাখেন বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান এড. নিতাই রায় চৌধুরী ছাড়াও জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, যুগ্ম-সম্পাদক মিজানুর রহমান খান, সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, প্রচার সম্পাদক হাজী আনিসুর রহমান মুকুল প্রমুখ।
ড. মঈন খান মরহুম তরিকুল ইসলামকে যশোর তথা দক্ষিণবঙ্গের মানুষের প্রাণের নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন। মন্ত্রী থাকাকালে তিনি যশোরের উন্নয়নে কীভাবে অবদান রেখেছেন তাও বর্ণনা করেন ড. মঈন।
বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান এড.নিতাই রায় চৌধুরী মরহুম তরিকুল ইসলামকে তার নেতা সম্বোধন করে বলেন, এই নেতার মৃত্যুর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো, যা কখনো পূরণ হবার নয়। এছাড়া তরিকুল ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে তার বড় ছেলে শান্তনু ইসলাম সুমিত ও ছোট ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বক্তব্য রাখেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার বাবাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়ায় অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি তার বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনার জন্য উপস্থিত জনতার কাছে দোয়া চান। তিনি যখন সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন অনেক মানুষকে কাঁদতে দেখা যায়।
জানাজায় বিশিষ্টজনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আজিজুল বারি হেলাল, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনি, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য প্রকৌশলী টিএস আইয়ুব, আবুল হোসেন আজাদ, ফারাজী মতিয়ার রহমান, যশোর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, সাবেক মেয়র ও নগর বিএনপি সভাপতি মারুফুল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি সৈয়দ মেহেদি হাসান রুমি, জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি কবির মুরাদ, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য ইকবাল কবির জাহিদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতা মহসিন কবির, জাসদের কার্যকরি সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলমসহ খুলনা বিভাগের দশ জেলা, উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন এবং যশোরের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু, জয়ন্ত কুমার কুন্ডু প্রমুখ। জানাজা শেষে তরিকুল ইসলামের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কারবালা কবরস্থানে। এখানে তাকে বাবা, মায়ের কবরের পাশে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়।
এদিকে, গত রবিবার রাত ৯টায় ঢাকায় তার শান্তিনগরের বাসভবনের সামনে প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল সোমবার সকালে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দ্বিতীয় এবং জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তৃতীয় নামাজে জানাজা শেষে মরদেহ হেলিকপ্টার যোগে দুপুর আড়াইটায় যশোরে আনা হয়। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ সোজা নিয়ে যাওয়া হয় তার ঘোপ জেল রোডের বাড়িতে। সেখান থেকে নেয়া হয় বিএনপি যশোর জেলা কার্যালয়ে। সেখানে মরহুমের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও সময়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। মানুষের প্রচন্ড ভিড়ের কারণে ওই কর্মসূচি স্থানান্তর করা হয় কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে। 
যশোর জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এড. সাবেরুল হক সাবু জানান, বৃহত্তর খুলনা বিভাগে বিএনপি’র অভিভাবক ছিলেন তরিকুল ইসলাম। তার মৃত্যুতে জেলা বিএনপি তিন দিনের শোক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সোমবার ছিল নেতা-কর্মীদের কালো ব্যাচ ধারণ। আগামী দু’দিন দোয়া মাহফিল ছাড়াও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।
উল্লেখ্য, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, যশোর সদরের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম গত রবিবার বিকেল পাঁচটার কিছু সময় আগে রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ ডায়াবেটিস, কিডনী, হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।

No comments

Powered by Blogger.